


বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, ভৌগলিক আকারে ছোট একটি দেশ। দেশের আয়তন এবং প্রশাসনিক কাঠামো বিবেচনা করলে, এটি ৫টি প্রদেশে ভাগ করার মতো উপযুক্ত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় উপদেষ্টা শাখাওয়াত হোসেন একটি বক্তব্যে, বাংলাদেশকে ৫টি প্রদেশে ভাগ করলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা সহজতর হবে বলে মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে জনমনে নানান প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিল্পব পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তা পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে উঠেনি। ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট ব্যক্তিরা ঘাপটি মেরে বসে আছে প্রায় প্রতিটি সেক্টরে, যেকোনো সময় ক্যু’র মত বিপত্তি তৈরি করতে প্রস্তুত। অপরদিকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারতীয় কূটচাল অব্যাহত রয়েছে। প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দিকে এগুলে, পার্বত্য অঞ্চলে ‘ফ্রি জুমল্যান্ড’ কার্ড যথাযথভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে ভারত। স্বাধীন জুমল্যান্ড দাবি করে আসা জেএসএস, জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ, কেনএনএফ এর মতো সক্রিয় সংগঠন গুলো আরও আস্কারা পাবে। বাস্তব প্রেক্ষাপট বিচার করলে, এই প্রস্তাবনার যৌক্তিকতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বরং বিভাগগুলোকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার মধ্যেই রয়েছে দেশের উন্নয়নের সম্ভাবনা।
বর্তমানে, বাংলাদেশ ৮টি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ। প্রত্যেকটি বিভাগে রয়েছে নিজস্ব প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। তবে, বিভাগীয় কাঠামোর কার্যকারিতা প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কারণ রাজধানী ঢাকার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রেই দেশের অন্যান্য অঞ্চলগুলোর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রত্যেকটি বিভাগে নিজস্ব প্রশাসনিক কেন্দ্র থাকলেও বেশিরভাগ কার্যক্রমই রাজধানী ঢাকার ওপর নির্ভরশীল। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি ছিল, যা ২০২৩ সালে প্রায় ২ কোটিতে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, বিভাগীয় শহরগুলোতে জনসংখ্যার হার নিম্ন এবং অনেক এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো অসম্পূর্ণ।
রাজধানীমুখী কর্মকাণ্ড কমানো প্রয়োজন:
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল এবং অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সংকটে রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকাতেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। দেশের উন্নয়নের জন্য ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগীয় শহরে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থানান্তর করা জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশেই রাজধানী স্থানান্তরের উদাহরণ রয়েছে। যেমন, মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুর থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পুত্রজায়ায় স্থানান্তর করেছে। এ ধরনের বিকল্প বাংলাদেশেও বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে, ঢাকা থেকে কিছু প্রশাসনিক দপ্তর অন্যান্য বিভাগীয় শহরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, যা দেশের আঞ্চলিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।
প্রদেশ ঘোষণা এবং এর প্রভাব:
বাংলাদেশে প্রদেশ ঘোষণা করা হলে, প্রাদেশিক সরকারের ধারণা তৈরি হবে, যা কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠতে পারে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি এমনিতেই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে জর্জরিত, এবং প্রাদেশিক কাঠামো এ সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের শাসনব্যবস্থা একটি একক কেন্দ্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। সংবিধানের ১ নং ধারায় বলা হয়েছে, “The Republic shall be a unitary state.” অর্থাৎ, বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র এবং এখানে প্রাদেশিক সরকারের ধারণা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। প্রদেশ ঘোষণা করতে হলে, সংবিধানের ১ নং ধারা সহ আরও অনেক ধারা সংশোধন করতে হবে। সংবিধানের ১১ নং ধারা অনুযায়ী, দেশের সব ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকলেও সংবিধানে প্রাদেশিক সরকার প্রতিষ্ঠার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। অতএব, প্রাদেশিক ব্যবস্থার জন্য সংবিধানে ব্যাপক সংশোধনের প্রয়োজন হবে, যা দেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোকে পুনর্গঠনের দাবি করবে। প্রদেশ বিভাজন হলে, নতুন প্রাদেশিক সরকারের স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠতে পারে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। সংবিধানের ৪৭ক ধারা অনুযায়ী, বিশেষভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা প্রদেশ বিভাজন করলে আরও জটিল হয়ে উঠবে।
বিভাগগুলোর ক্ষমতায়ন:
বিকল্প সমাধান বাংলাদেশকে যদি ৫টি প্রদেশে বিভক্ত না করা হয়, তাহলে কী করা উচিত? এখানে বিভাগগুলোর কার্যকরী ক্ষমতা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিভাগীয় প্রশাসনগুলোকে শক্তিশালী করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
বিভাগীয় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: প্রতিটি বিভাগে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
বিভাগীয় প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ: বিভাগীয় শহরগুলোতে পর্যাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে ঢাকার উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
প্রযুক্তির ব্যবহার: ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভাগীয় শহরগুলোতে সেবা সহজলভ্য করা।
উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো: স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে অধিক গুরুত্ব দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা।
স্থানীয় ক্ষমতায়ন: স্থানীয় জনগণকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
শাখাওয়াত হোসেনের প্রস্তাবনা: যৌক্তিকতা এবং পর্যালোচনা
প্রদেশ বিভাজনের প্রস্তাবনায় যে চ্যালেঞ্জগুলো সৃষ্টি হবে, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমাধান করার জন্য এখনও কার্যকর কোনো রূপরেখা নেই। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করার জন্য এই ধরনের প্রস্তাবগুলোর উপর আরও গবেষণা করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি উপদেষ্টাদের উচিত জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সমগ্র দেশের সমৃদ্ধির জন্য প্রদেশ বিভাজনের পরিবর্তে বিভাগগুলোর ক্ষমতায়ন এবং কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণের দিকে মনোনিবেশ করা অধিক কার্যকর হবে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নয়, বরং বিভাগীয় ক্ষমতায়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হতে পারে।
লেখক, ইমরান হোসেন হিমু
সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
সাব এডিটর : এ.এস. খালেদ, আবু তাহের

