


ভাটির হাওড়ে ক্ষেতমজুরদের নতুন ভূমিকা
ভাটির হাওড়ের বিস্তীর্ণ জমিতে ক্ষেতমজুররাই এখন চাষাবাদের মূল চালিকা শক্তি। একসময়ে এই ক্ষেতমজুরদের বলা হতো কামলা বা ক্ষেত-কামলা। সমাজে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য নিয়ে বেঁচে থাকা এই শ্রমিকরা এখন হাওরের বিস্তীর্ণ জমি আবাদ করে সমাজে নতুন পরিচিতি পেয়েছে।
একসময় এই কামলারা গৃহস্থ কৃষকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজের অনুরোধ করত। ছয় মাসের জন্য ‘বদ্ধ’ হতো, অর্থাৎ নিজেদের শ্রম বিক্রি করত। সুঠাম ও শক্তিশালী কামলাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, আর বাকিরা মানবেতর জীবনযাপন করত। পঁচিশ থেকে তিরিশ ভাগ কামলা ভালো গৃহস্থ বাড়িতে কাজ পেত, বাকিরা রোজ-কামলার উপর নির্ভর করত। তখন কাজ না পেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটানো ছিল সাধারণ চিত্র।
গৃহস্থ কৃষকেরা ও ক্ষেতমজুরের ভূমিকা
অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারগুলো ছিল ছোটখাটো মৌসুমি ধান উৎপাদন কারখানার মতো। ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাল জমি আবাদ করতে তিরিশ জনের মতো কামলার প্রয়োজন হতো। কামলারা শুধু ধান রোপণ করত না; বাঁশের বেত আঁশানো, উড়া পাইলা, ডুলি, কুলা তৈরি, গাই-দোয়ানোর মতো কাজেও পারদর্শী ছিল।
সামাজিক পরিবর্তন ও ক্ষেতমজুরের নতুন পরিচিতি
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই কামলারা গৃহস্থ বাড়িতে বদ্ধ হওয়া বন্ধ করে দেয়। তারা বুঝতে পারে যে রোজ-কামলা বা ভাগালো পদ্ধতিতে কাজ করাই তাদের জন্য লাভজনক। নিজেদের এলাকায় কাজ ফুরিয়ে গেলে তারা ভিন জেলায় চলে যায় ধান কাটার কাজে। এতে করে তাদের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। ধীরে ধীরে তারা নিজেরাও জমি চাষাবাদ শুরু করে, প্রথমে দুই-তিন বিঘা, পরে পাঁচ-ছয় বিঘা, এখন বারো-চৌদ্দ বিঘা পর্যন্ত জমি আবাদ করছে।
ক্ষেতমজুর থেকে প্রান্তিক কৃষক
বর্তমানে ক্ষেতমজুররা শুধুমাত্র কামলা নয়, নিজেরাই প্রান্তিক কৃষকে রূপান্তরিত হয়েছে। হাওড় এলাকার বিশাল জমিতে তাদের শ্রমে বোরো চাষ হচ্ছে। আগে যে কামলারা শুধু কাজ খুঁজে বেড়াতো, তারা এখন নিজেরাই উৎপাদক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও ক্ষেতমজুরদের চ্যালেঞ্জ
বিশের দশকের শুরুতে হার্ভেস্টার মেশিন আসার ফলে ধান কাটার কাজে কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হলেও ধানের ভালো দাম পেয়ে তারা টিকে থাকতে পেরেছে। তবে কৃষকদের জমি হারানোর কারণে হাওড়ে বড় গৃহস্থ কৃষক প্রায় নেই বললেই চলে। এখন মূল কৃষি কাজের দায়িত্ব ক্ষেতমজুররাই বহন করছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
২০২৫ সাল পর্যন্ত হাওরের জমি আবাদ রাখার প্রধান ভূমিকা ক্ষেতমজুরদের হাতেই। আগামী দিনে এই ক্ষেতমজুররাই সমাজের নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হবে বলে আশা করা যায়। কেননা তারা এখন নিজেদের ‘ক্ষেতমজুর’ না বলে ‘প্রান্তিক কৃষক’ বলতে পছন্দ করে। তাদের এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে, ভবিষ্যতে তারা সমাজে আরো দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলবে।
লেখক : চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, কৃষক-ক্ষেতমজুর ও হাওড় আন্দোলনের সংগঠক।


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
সাব এডিটর : এ.এস. খালেদ, আবু তাহের

