শহীদুল ইসলাম রেদুয়ান : সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের কাবিটা (কাবিখা/কাবিটা) স্কিমের আওতায় হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বাংলাদেশ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে আগাম বন্যা মোকাবিলায় হাওরাঞ্চল ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জানা যায়, চলতি অর্থবছরে উপজেলার ৭টি হাওরে মোট ৬৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কাউয়াজুরী হাওরে ২১টি, দেখার হাওরে ১৪টি, খাই হাওরে ১৬টি, জামখলা হাওরে ৬টি, কাঁচিভাঙ্গা হাওরে ৪টি, সাংহাই হাওরে ৩টি এবং ছাইল্লানি হাওরে ৩টি প্রকল্প রয়েছে। এসব কাজে সরকারের বরাদ্দ ১২ কোটি টাকার বেশি। তবে নির্ধারিত সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হলেও অধিকাংশ স্থানে কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক স্থানে অক্ষত বা কার্যত ঝুঁকিমুক্ত বাঁধেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরোনো বাঁধের মাটি মেশিনে কেটে সামান্য সংস্কার দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও গ্রাম রক্ষা বাঁধ বা চলাচলের রাস্তা ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন এবং হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন শান্তিগঞ্জ উপজেলা কমিটির নেতারা দাবি করেছেন, প্রায় ৪০টি পিআইসিতে (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) অপ্রয়োজনীয় বা অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, ২১টি পিআইসিতে অক্ষত বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং অন্তত ৩টিতে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলার অন্তত ৩৫টি পিআইসি একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একাধিক কমিটি গঠন, বাপ-ছেলে বা ভাই-ভাইকে একই পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত করা, পূর্বের কমিটি বাদ দিয়ে নতুন করে ‘নিজস্ব লোক’ বসানোর মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে পুরো কমিটি পরিবর্তন করে নতুন সদস্য মনোনয়ন দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক হাওরে এখনো মাটিকাটা ও কম্পেকশনের কাজ চলমান। গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারগুলো টেকসই নয় বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, আগাম বন্যা এলে অসম্পূর্ণ ও দুর্বল বাঁধ টিকবে না। অন্যদিকে পাউবোর দাপ্তরিক তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই বলেও দাবি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) মোঃ মনিরুজ্জামান মোহনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “আমাদের হিসাবে অধিকাংশ বাঁধের কাজ সম্পন্ন। তবে কেউ পিআইসির নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তা খতিয়ে দেখব।”
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের আশঙ্কা, ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অনিয়ম হলে ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদেরই বইতে হবে। তাদের ভাষায়, “কাগজে-কলমে উন্নয়ন দেখিয়ে বাস্তবে দুর্বল বাঁধ রেখে গেলে আগাম বন্যায় ফসল রক্ষা সম্ভব হবে না।”
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে প্রতিবছর একই চিত্র পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে। জাতীয় স্বার্থে হাওরাঞ্চলের ফসল ও কৃষক সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধনকৃত পত্রিকা।
সম্পাদক: কাউছার উদ্দিন সুমন, নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ, বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান। অস্থায়ী বার্তা বাণিজ্যিক কার্যলয়: জয়নগর বাজার, সুনামগঞ্জ। ই-মেইল: Haworbartaofficials@gmail.com মোবাইল: ০১৬৪৭-৮৩৪৩০৩।