


বিশেষ সংবাদদাতা :
সুনামগঞ্জের ইজারাবিহিন ধোপাজান চলতি নদীতে একরাতেই কমপক্ষে ৫ কোটি টাকার বালি লুটতরাজ করা হয়। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি এ.কে.এম আবু নাসার,সহ সভাপতি সাইফুল আলম ছদরুল ও প্রভাষক ফজলুল করিম সাঈদ। এছাড়াও ঐ তথ্যের সাথে একমত পোষন করেছেন ধোপাজান নদীর তীরের বাসিন্দা সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান খুরশিদ মিয়া ও পশ্চিম সদরগড় নিবাসী সায়েদ আলী মোল্লা। তারা বলেন,বর্তমান মার্কেটে প্রতিফুট বালির মূল্য কমপক্ষে ৩০ টাকা। ধোপাজান নদীতে প্রতিরাতে ৩ ধরনের নৌপরিবহন দ্বারা বালি লুটতরাজ করা হয়। নৌপরিবহনগুলো হচ্ছে ষ্টিলবডি বড় নৌকা,ষ্টিলবডি ছোট নৌকা ও কাঠবডি নৌকা। এর মধ্যে একটি স্টিলবডি বড় নৌকায় ৫ হাজার ফুট,স্টিলবডি ছোট নৌকায় ৩ হাজার ফুট এবং কাঠবডি ছোট নৌকায় ৩শত ৫০ ফুট বালি বহন করা হয়। বহনকরা স্টিলবডি বড় ইঞ্জিন নৌকায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা,স্টিলবডি ছোট ইঞ্জিন নৌকায় ৯০ হাজার টাকা এবং কাঠবডি ছোট নৌকায় ১০ হাজার ৫শত টাকার বালি বহন করা হয়। সে হিসেবে ঐ রাতে ২৪০টি স্টিলবডি বড় নৌকায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার বালি,৭৫টি স্টিলবডি ছোট নৌকায় ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বালি ও ১২৬টি কাঠবডি নৌকায় ১৭ লক্ষ ১ হাজার টাকার বালি হিসেবে সর্বমোট ৪ কোটি ২৯ লাখ ২১ হাজার টাকার বালি লুটতরাজ করা হয়। এ তথ্যটিকে সত্য স্বীকার করে সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ১,২ ও ৩নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যা মোছা: তানজিনা বেগম বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বর বুধবারের মধ্যেই কোন এক রাতে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা মূল্যের বালি লুটতরাজ করা হয়েছে। এভাবে গত ৫ বছরে প্রতিটি রাতেই বালি চুরি হয়েছে।
জানা যায়,ধোপাজান চলতি নদীতে সেনাবাহিনীর নজরদারীর পরও ৮৭টি স্টিলবডি ও ৩০/৪০টি পঙ্গপাল নৌকায় রাতের বেলা বালিচুরি সংগঠিত হয়েছিলো গত ২১ সেপ্টেম্বর শনিবার দিবাগত রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। ঐ সময়ে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই দুলাল আহমদসহ একদল পুলিশ ধোপাজান নদীতে নিয়মিত টহলের দায়িত্বে থাকার পরও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি সরকারের মূল্যবান খনিজ সম্পত্তি ডাকাতির মহোৎসব। রাত সাড়ে ৩টায় একসাথে ৮৭টি ইঞ্জিনচালিত স্টিলবডি নৌকা ও ৩০/৪০টি পঙ্গপাল নৌকায় ড্রেজার ও বোমা মেশিন দ্বারা ধোপাজান নদীর তীর কেটে ও নদীর তলদেশ হতে বালি বুঝাই করে মুহুর্তের মধ্যে অবৈধ বালিবাহী স্টিলবডি ও পঙ্গপাল নামের নৌযান ও নৌকাগুলো বলতে গেলে অনেকটা বিনাবাধায় পুলিশের সামনে দিয়ে অতি দ্রæতবেগে বের হয়ে যায়। এ ঘটনায় ইতিপূর্বে সংবাদ পরিবেশিত হলেও বন্ধ হয়নি বালিচুরি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই হামিদ ও এএসআই গিয়াস উদ্দিন,৬ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে ধোপাজান নদীর পূর্বপাড়ে নিয়মিত টহলে থাকার পরও পুলিশের সামনে দিয়ে চোরাই বালি নিয়ে বের হয় ৩৫০টি ষ্টিলবডি বড় নৌকা ও স্টিলবডি ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা। এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সদর মডেল থানার এসআই জুলহাস ও এএসআই মোঃ ওয়াসিম ৬ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে ধোপাজান নদীর পূর্বপাড়ে নিয়মিত টহলে থাকার পরও পুলিশের সামনে দিয়ে চোরাই বালি নিয়ে বের হয় ২৫০টি ষ্টিলবডি বড় নৌকা ও স্টিলবডি ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা। একইভাবে ২২ সেপ্টেম্বর রবিবার দিবাগত রাত ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সদর মডেল থানার এসআই মহিন ৬ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার সামনে দিয়ে সারারাতব্যাপী একটির পর একটি করে মোট ২৫০ টি ষ্টিলবডি বড় নৌকা,স্টিলবডি ছোট নৌকা ও কাঠবডি নৌকা বালিবুঝাই করে সহজে বের হয়ে গেলেও বালিচুরি বন্ধে কোন পদক্ষেপ নেননি তারা।
এতে পরিবেশবাদীরা চরম হতাশা প্রকাশ করে বলেন,ধোপাজান নদীর বালি পাথর চুরি করার জন্য একটিমাত্র নৌপথ হচ্ছে ধোপাজান নদীর প্রবেশ মুখ। ঐ প্রবেশ মুখে পুলিশ মোতায়েন করার অর্থই হচ্ছে এই জায়গা দিয়ে যাতে কোন বালিবুঝাই করা নৌকা বের হতে না পারে এবং বালি লুটতরাজের উদ্দেশ্যে কোন নৌপরিবহণ নদীতে প্রবেশ করতে না পারে। অর্থাৎ কেউ বালিবুঝাই করে স্টিলবডি বড় নৌকা বা স্টিলবডি ছোট নৌকা বের করলে পুলিশ যাতে সেগুলো আটক করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করে। কিন্তু আমরা গত কয়েকদিনে পুলিশের ভূমিকায় একেবারেই হতাশ। মোটা অংকের নগদ টাকা ঘুষ দিয়ে নিরাপদে ৭০/৮০ জন চোরাকারবারী অনায়াসে একটি ইজারাবিহিন বালিমহালের মূল্যবান সরকারি খনিজ সম্পদ লূটতরাজ করে যাচ্ছে।
জানতে চেয়ে নদীতে দায়িত্বপালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে কল করলে তারা নদীতে টহলে থাকার কথা স্বীকার করলেও ঘুষ নিয়ে বালিচুরির ঘটনায় সহায়তা করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু ঐ ৩ রাতে সুরমা নদীর পাড় তেঘরিয়া ফেরিঘাট ও ধোপাজান নদীর পাড়ে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক সরজমিনে নৌকা ছাড়ার দৃশ্য অবলোকন করেন।
সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু বলেন, ভারত সীমান্তের পাদদেশ বেয়ে আসা প্রচুর পরিমাণ বালি ধোপাজান নদী হতে প্রতিরাতে ড্রেজার ও বোমা মেশিন দ্বারা বুঝাই করে হরেক রকম নৌযানের মাধ্যমে বের করে নেয় একটি শক্তিশালী চোরাকারবারী সিন্ডিকেটচক্র। আমরা সুনামগঞ্জের সকল সাংবাদিকরা ঐ চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনপূর্বক সরকারের মূল্যবান খনিজ সম্পদ রক্ষার জন্য নবাগত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে আনুষ্ঠানিক মত বিনিময় সভায় সুস্পষ্ঠভাবে জানিয়েছি। তারপরও এখন পর্যন্ত বালি লুটতরাজ বন্ধ হয়নি।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সক্রিয় সদস্য মোঃ ইসলাম খান বলেন, বালি চুরির ভিডিও ও সংবাদ দেখে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রতিদিন ৫ কোটি টাকার বালি লুটতরাজ হলে গত ৫ বছরে নাজানি কত শত কোটি টাকার বালি লুটতরাজ করা হয়েছে। তিনি বলেন,বাংলাদেশ সরকারের উচিত চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে এবং তাদের স্ত্রী সন্তানাদি ও শ্বশুড় শ্বাশুড়ি এবং শ্যালা সম্মন্ধির ব্যাংক হিসাব জব্দ করে ক্ষতিপূরন আদায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এ সম্পদের আত্মসাৎকারীদের বিচারের মুখোমুখি দাড় করানো।
নবাগত পুলিশ সুপার আ.ফ.ম. আনোয়ার হোসেন খান পিপিএম বলেন,আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। তারপরও প্রতিরাতে বালিচোরদের পরিবহণসহ আটক করে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে মামলা দায়ের অব্যাহত রেখেছি।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া বলেন,ধোপাজান নদীর ইজারা কার্যক্রম গত ৪/৫ বছর বন্ধ থাকায় সরকারের মূল্যবান খনিজ সম্পত্তি বেহাত হয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন মাঝে মাঝে চোরাচালান বিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানের মাধ্যমে বালিচুরি বন্ধে সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
সুনামগঞ্জ সেনাক্যাম্প এর অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল নাফিজ ইমতিয়াজ এ প্রতিবেদককে বলেন,জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট সকলকে সাথে নিয়ে অবিলম্বে ধোপাজান নদীর বালি পাথর রক্ষায় অভিযান পরিচালনা করবে সেনাবাহিনী।


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
সাব এডিটর : এ.এস. খালেদ, আবু তাহের

