


ওবায়দুল মুন্সী : কৃষক সন্তান হিশেবে আমিও ছোটবেলা হালচাষ করেছি। ধানের চারা ক্ষেতকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় ‘যালাক্ষেত’ বলা হয়। চারা উত্তোলনকে আমরা বলি ‘যালাফুরা’ আর ধান রোপণকে ‘ধান রোয়ানি’ বলে থাকি। এই সবগুলো কাজ আমরা যারা গাঁয়ে জন্মেছি কমবেশি অনেকেই করেছি।
আমার এখনও মনে আছে ছোটবেলা প্রথম কামলাদের (শ্রমিকদের) ভাত নিয়ে গিয়েছিলাম ক্ষেতে। ফুলবাড়ির জসীম ভাই আমাকেও খাওয়ার জন্য বললে আমি প্রথমে না করি। যখন বলেন ‘খেয়ে দেখ! বাড়ির তাইক্কা মজা লাগবো ‘। আমিও বন্ধুদের কাছে শুনেছি, হাওরের ভাত খেতে দারুণ মজা লাগে। তাই আর না করিনি, সবার সাথে খেতে বসে যাই।
আর আমাদের বাড়ি থেকে আসা পাঁচ কামলার ভাত আট কামলায় খেতে পারতো।সেদিন আমি ছাড়াও অন্য আরেকজনের আরও দুই কামলা ভাত খাচ্ছিল। একবার এ নিয়ে একদিন রাতে আব্বাকে বলেছিলাম- ‘ও আব্বা আমরার কামলার ভাত দেকি,অন্যদের কামলারাও খায়বা। আমি আম্মারে খইছি অত ভাত দিতা না। তুমি নাকি খইছো ভাত বেশখরি দিতে’। আব্বা বলেন-‘অয় ফুত, আমিই খইছি’! আমি বললাম-‘মাইনষে দেখি খমাইয়া ভাত দেয়! আর অতা কামলারা আমরার কামলার লগে ভাত খাইন আইয়া’। আমার আব্বা তখন আমাকে বুঝিয়ে বলেন-‘ও ফুত, কামলারা কামের মানুষ! কাম খরলে বেশি ভুখ (ক্ষুধা) লাগে। তাই খানিও তারার বেশি লাগে! তারা ফেট ভইরা খাইলে, কাম করবো ভালা। দেখনানি, ‘যারা কামলারে ছাতাইন (কষ্ট দেওয়া) ইতার কামলায় মনের মাঝে কষ্ট ফাইন। এরলাগি তারার কাম তোরা অয়! আমরা ফেট ভইরা ভাত খাবাই খইরা আমরার কাম অন্যদের চেয়ে বেশি অয় ‘। আমি বললাম-‘অয় বা আব্বা,ঠিকই খইছো। আমি দেখছি,অন্যদের কামলারা আছরের পরফরই উঠিযায়, আর আমরার কামলারা মাগরিবের সময়ও উঠতে চায় না। অন্যদের তাকি(চেয়ে) আমাদের কামও বেশি হয়।’ আব্বা খুশি হয়ে বললেন-‘অনে (এখন) ভালাই বুইচ্ছো।’
তখনকার সময়ে গ্রামের কিছু গিরস্ত এমনই ছিলেন। কিন্তু তাদের এই সামান্য কিপ্টামি যে অনেক বড় ক্ষতি করতো সেটা মাথায় নিতেনই না! এদিকে আমার বাবা ছিলেন খুবই মানবিক।
যদিও আমরা বর্তমান শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউপির পাইকাপন গ্রামের বাসিন্দা। আমরা ছিলাম উত্তরে, জগন্নাথপুর উপজেলার,কলকলি ইউপির তেলিকোনা গ্রাম ছিল পুর্বে,আর হাট বসতো দিরাই উপজেলার, জগদল ইউপির দক্ষিণ দিগের সিকন্দরপুর গ্রামের পাশেই কিন্তু নাম তার ‘হুসেনপুর বাজার’।পশ্চিমে ছিল দিরাই উপজেলার নগদিপুর (নগদিপুর নামে বাজারও আছে) ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার কাউয়াজুরি গ্রাম। এই বাজার বা হাটই ছিল আমাদের আশেপাশের দশ-বারো গ্রামের বাজার বা হাট। সপ্তাহের শনি-মঙ্গলবার এই দুদিন হাটবার ছিল। এই হাটবারেই ‘যালা রোয়ানির'(চারা রোপণের) সময় কামলাদের রোজ (বেতন) অগ্রিম দিয়ে আসতে হতো। সেদিন বাবার সাথে আমিও ছিলাম। আমি দেখতে পাই, আব্বা যখন দশ জন কামলাকে অগ্রিম বেতন দিচ্ছেন সেখানে বিশজন এসে বলছেন আমি যাবো, আমি যাবো! সেদিন আব্বার আগে কেউই কামলা পায়নি। অনেক কামলাকে বলতে শুনেছি-‘চাচাজি আমারেও নেইনগি, রোজ ফরে দিলেই অইবো।’ এতে দেখা যেত-কামলা দরকার আটজন, এসে যেতো দশজন!’
দেখতে দেখতে গরু দিয়ে জমি চাষ, কামলা দিয়ে রোয়া (চারা রোপণ),’যালা খছলানি'(হাত দিয়ে চারার আগাছা পরিস্কার) ইত্যাদি কাজ করানো হারিয়ে যেতে বসেছে। ডিজিটালিশ এই যুগে এসব কাজ এখন অল্প সময়ের মধ্যেই করে দিচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি। এনালগ সময়ে যে কাজগুলো ছিল খুবই কঠিন এবং কষ্টকর। কিন্তু কষ্টকর হলেও বোশেখি একটা আলাদা আমেজ পাওয়া যেতো। যান্ত্রিকতার মধ্যে সেই আমেজটা নেই!
ফিচারে আপলোডকৃত ভিডিও ফুটেজ দুটো আমার পাইকাপন গ্রামের জামখলার হাওরের। প্রথম ভিডিওতে আমার বড়ভাই’র জমিনে হারভেস্টারে ধান কাটছে। দ্বিতীয় ভিডিওতে মাড়াইকৃত ধান বস্তায় ভরছে আমার এক ভাতিজা গিলমান ও আরেকজন লোক।
এখন আর ধান কাটতে আগেরমতো ‘বেপারি’ (যারা ধান কাটে) লাগেনা। কৃষকদের বৈশাখি পুরো শ্রমিকের কাজ এক যন্ত্রেই অল্পসময়ে হয়ে যায়। কিন্তু একদিকে এই আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রগুলো আমাদের শ্রমিকদের বেকারত্বের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শ্রমিকদের বেকারত্ব ঘুচানোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজন।
লেখক: কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
পাইকাপন, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ-৩০০০


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
সাব এডিটর : এ.এস. খালেদ, আবু তাহের

