


লেখক: ওবায়দুল মুন্সী
জমিদার আমলে দেশের বহু প্রান্তে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। মূল কারণ ছিল শাসকদের সেই সময়কার মানসিকতা—তাঁরা মনে করতেন, প্রজারা যদি শিক্ষিত হয়, তবে জমিদারি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে সে সময়েও কিছু প্রগতিশীল ব্যক্তি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন ডা. হুশিয়ার আলী স্যার—একজন নিরহংকারী, নিঃস্বার্থ এবং শিক্ষানুরাগী মানুষ।
ডা. হুশিয়ার আলীর জন্ম ৩ মার্চ ১৯৫৪ সালে, সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার তেলিকোনা গ্রামে। পিতা মরহুম হাজী আসক উল্লাহ ও মাতা রয়মুনা বিবি। তিনি ছিলেন পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের জনক। জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন শিক্ষার প্রতি নিবেদিত।
আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলহাজ্ব আব্দুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়, সিকন্দরপুর, দিরাই-এর প্রতিষ্ঠায় তাঁর অসামান্য অবদান আজও স্মরণীয়। মো. আখলাক হোসেন সোহেল ভাই ও সম্ভাব্য দরগাপাশা ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদুল হাছান দোলন মামার দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যাঁরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন—এএইচএম রুহুল হুদা, আঞ্জব আলী, সুবেদার সিরাজুল হক, ইনামুল হক ইমা, ইলিয়াস আলী, মনির উদ্দিন, আসক আলী মেম্বার, আব্দুল করিম, আব্দুল মান্নান, নুরুল ইসলাম, ডা. মামুনুর রশিদ, আবু এহিয়া খায়রুজ্জামান, শাহাবুদ্দিন মাস্টারসহ আরও অনেকে।
বিদ্যালয়ের শুরু হয়েছিল সিকন্দরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্বদিকের একটি কক্ষে। পরে স্থানান্তর করা হয় বর্তমান স্কুল প্রাঙ্গণে। প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক ছিলেন ডা. হুশিয়ার আলী, অ্যাডভোকেট এএইচএম রুহুল হুদা বেলাল, ডা. মামুনুর রশিদ ও সুনামগঞ্জ থেকে আগত শামসুদ্দিন মাস্টার।
প্রথম দিককার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন: আবু সাঈদ টুকু, শিফা, রফিক মিয়া, এনামুল, সুফি, তোফায়েল, মির্জা হোসাইন, মছরু মিয়া, মিজানুর রহমান তালুকদার রিপন, এমরান হোসেন, ইমদাদ হোসেন, রত্না, স্বপ্না, জ্যোতি, রুনা, বিউটি প্রমুখ।
ডা. হুশিয়ার আলী স্যার শুধু স্কুল প্রতিষ্ঠাতাই নন, এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বহু ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ছিলেন অগ্রণী। তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি চেয়েছিলেন অবহেলিত জনপদে শিক্ষার আলো জ্বালাতে। আজ সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে—আলহাজ্ব আব্দুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীছাত্রীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাফল্যের আলো ছড়াচ্ছে।
তাঁর আচরণ ছিল অমায়িক, ভদ্র এবং অহংকারহীন। সমাজে কিছু মানুষ অহংকারে নিজেদের বড় মনে করলেও, ডা. হুশিয়ার আলী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ‘বড় মানুষ’, যাঁকে সবাই ভালোবেসে স্মরণ করে।
দুঃখজনকভাবে, ২ জুলাই ১৯৯১ সালে এক ঝড়ের রাতে চণ্ড্রিডহর জলপথে নৌকা দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তাঁর এই অকাল প্রয়াণে গোটা অঞ্চল শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। বহু মানুষের চোখে নেমে এসেছিল অশ্রু।
ডা. হুশিয়ার আলী শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না—তিনি ছিলেন সমাজগঠনের এক আলোকবর্তিকা।
কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
পাইকাপন, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
সাব এডিটর : এ.এস. খালেদ, আবু তাহের

