শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:২১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ

ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের মনগড়া মতবাদ,, মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী

হাওড় বার্তা ডেস্কঃ
  • আপডেট বুধবার, ২১ এপ্রিল, ২০২১
  • ৩৮৯ বার পড়া হয়েছে

 

হাওড় বার্তা

 

       ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের মনগড়া মতবাদ
   মাওলানা মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী

 

জীবনে বহুবার মানুষকে বলতে শুনেছি, “কাবা শরীফের ওপর দিয়ে বিমান কিংবা পাখি উড়তে পারে না।” আমি এসব কথাকে হেয়ালিভাবে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু একবার আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জুনিয়রকে এ বিষয়ে তর্ক করতে দেখলাম। একজন দাবী করছে, বিমান ও পাখি উড়তে না পারা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। আরেকজন তা মানতে চাইছে না। তাই প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে ‘নাস্তিক’ বলছে। তাদের তর্ক শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।

ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করার বাসনা প্রত্যেক মুসলমানের মধ্যে থাকে। তবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে আমরা এমন মতবাদ (Doctrine) তৈরি করে ফেলি, যা দ্বীনি দিক থেকে ভিত্তিহীন, যৌক্তিক বিবেচনায়ও ভুল। ওপরের ঝগড়াটির কথাই ধরুন। এটি ঠিক যে, কাবা শরীফের ওপর দিয়ে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল করে না। সেটি অলৌকিক কারণে নয়, বরং নিরাপত্তাজনিত কারণে। সৌদি সরকার মক্কা শরীফকে No Flying Zone ঘোষণা করেছে। কারণ দুর্ঘটনাবশত কোনো বিমান মাটিতে পতিত হলে মক্কা শরীফে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। শুধু সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত হেলিকপ্টার সেখানে উড়ার অনুমতি পায়। এরকম নিরাপত্তাজনিত কারণে আমেরিকার হোয়াইট হাউজ, ভারতের তাজমহল, বৌদ্ধধর্মের পবিত্র স্থান তিব্বত ইত্যাদি এলাকা ও স্থাপনার ওপর দিয়ে বিমান চলাচল করার অনুমতি নেই। এসব জায়গাকে No Flying Zone বলা হয়।

কাবা শরীফের ওপর দিয়ে পাখি উড়ে না— এ কথাটিও ভিত্তিহীন। এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং ধারণকৃত ভিডিওতে পাখি উড়ার দৃশ্য স্পষ্ট দেয়া যায়। আমি নিজে পাশে বসে বহুবার দেখেছি। শুধু যে উড়ে তা নয়, পাখি কাবা শরীফের ওপর বসে। এমনকি গিলাফের মধ্যে পাখির বিষ্টা লেগে থাকতে দেখা যায়। বিশ্বাস না হলে ইন্টারনেটে খুঁজে দেখুন। এইসব বিষয় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বা অ-শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় নয়। কারণ আল্লাহ এগুলোকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে তৈরিই করেননি। এসব মতবাদ মানুষের নিজের বানানো। আল্লাহ কাবা শরীফকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, সেটি مَعْنَوِيّ তথা তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক। তাই কাবা শরীফের ওপরে চড়া যায়, উড়াও যায়। মক্কা বিজয়ের দিন বিলাল রা. কাবা শরীফের ওপরে উঠে আযান দিয়েছিলেন। প্রতি বছর ৯ই জিলহজ গিলাফ পরিবর্তনের সময় সৌদি কর্মকর্তারা কাবা শরীফের ওপরে উঠেন। এতে কোনো গোনাহ নেই। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ এ ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেননি।

আমাদের সমাজে দেখা যায়, কোথাও ভূমিকম্প হলে মানুষ একটি মসজিদের ছবি দিয়ে বলে, “সবকিছু ভেঙ্গে গেলেও মসজিদ ভাঙ্গেনি!” ভাবখানা এমন, যেন মসজিদ না ভাঙ্গাই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের আলামত। অথচ এ কাজটি ভুল এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কাল যদি মসজিদ ভেঙ্গে যায় অথবা মসজিদে দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী কোথায় যাবে? এমন তো নয় যে, মসজিদ কখনও ভাঙ্গে না। খোদ কাবা শরীফ কতবার ভেঙ্গেছে। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. ও তাঁর বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য একবার ইয়াযিদ, আরেকবার হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা শরীফে হামলা করেছিল। দু’বারই কাবা শরীফের দেয়াল ভেঙ্গেছে, আগুন ধরেছে। ১৯৭৯ সালে জুহাইমান আল-উতাইবী ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী হাজীদেরকে বন্দী বানিয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী কাবা শরীফে সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “কিয়ামতের পূর্বে ছোট পা-বিশিষ্ট্য এক হাবশি ব্যক্তি কাবা শরীফ ভেঙ্গে ফেলবে” [সহীহ মুসলিম]।

মক্কা শরীফ بَلَدًا آمِنًا তথা নিরাপদ শহর। মক্কায় রক্তপাত ঘটানো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। তার মানে এই নয় যে, সেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দুর্ঘটনা ঘটে না। আবরাহার হস্তিবাহিনীকে ধ্বংস করার যে কাহিনী আমরা জানি, সেটি একবারই হয়েছিল [সুরা ফিল]। এভাবে কিয়ামতের পূর্বে মক্কায় ইমাম মাহদীকে আক্রমণ করতে আসা বাহিনীকেও আল্লাহ মাটিতে ধসিয়ে দেবেন [সুনান আবি দাউদ]। কিন্তু এসব আসমানি সাহায্য রোজ রোজ আসে না। এগুলো একান্তই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। আল্লাহ যখন চান, তা হয়। স্বাভাবিকভাবে দুনিয়াকে আল্লাহ একটি নিয়মে বেধে দিয়েছেন। দুনিয়া সে নিয়মেই চলে। অতএব নিজের মনগড়া কোনো অলৌকিক মতবাদ দিয়ে ইসলামকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। এসব মতবাদ বাতিলের জন্য দরজা খুলে দেয়।

একবার এক নাস্তিকমনা ব্যক্তি ব্যঙ্গ করে আমাকে বললেন, “ইসলাম যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে মক্কায় কেন দুর্ঘটনা ঘটে? হজের সময় হাজীরা কেন মারা যায়?” আমি তাকে কুরআন শরীফ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, “পুরো কুরআনে আমাকে একটি আয়াত দেখিয়ে দিন, যেখানে আল্লাহ ‘মক্কায় দুর্ঘটনা ঘটে না, কিংবা হজে গেলে কেউ মরে না’ এরকম কোনো ওয়াদা দিয়েছেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরকম কিছুই বলেননি। বরং আপনি নিজে একটি মতবাদ বানিয়ে সেটিকে ইসলামের ওপর আরোপ করে দিতে চাইছেন।”

ইসলাম আল্লাহর মনোনিত একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠতম জীবনবিধান। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ আল্লাহর কিতাব এবং আল্লাহর নবী ﷺ এর জীবন। এগুলো বাদ দিয়ে কেউ যখন কোনো মনগড়া তথ্যকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের দলিল বানিয়ে হাজির করে, এরপর যখন দেখে তার দাবীটি ভুল, তখন ইসলামের ব্যাপারেই তার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, কেউ যখন এসব ভুল তথ্য নিয়ে ইসলাম-বিদ্বেষী নাস্তিকদের সাথে তর্ক করতে যায় এবং নাস্তিক তাকে ভুল প্রমাণ করে দেয়, তখন দ্বীন একটি হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হয়। অতএব দ্বীনি বিষয়ে কথা বলতে হলে আমাদেরকে সাবধান থাকতে হবে।

সর্বশেষ সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সব ধরনের সংবাদ পেতে ক্লিক করুন।
দৈনিক হাওড় বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
jphostbd-2281