শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:৪০ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও ফজিলত – মুফতি আল আমিন ইসলাম সরকার যুক্তিবাদী

হাওড় বার্তা ডেস্কঃ
  • আপডেট রবিবার, ৯ মে, ২০২১
  • ২০০ বার পড়া হয়েছে

 

আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদর রজনী, এর ফারসি হলো শবে কদর। অর্থ সম্মানিত মর্যাদাপূর্ণ ও মহিমান্বিত, সম্ভাবনাময়, ভাগ্যনির্ধারণী রজনী। পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমদ্বান মাস, কোরআন নাজিলের রাত শবে কদর।

লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও মর্যাদা ঘোষণা করে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّآ أَنزَلْنَٰهُ فِى لَيْلَةِ ٱلْقَدْرِ

আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে।
We have indeed revealed this (Message) in the Night of Power:

وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ

শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন?
And what will explain to thee what the night of power is?

لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
The Night of Power is better than a thousand months.

تَنَزَّلُ ٱلْمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ

এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে।
Therein come down the angels and the Spirit by Allah´s permission, on every errand:

سَلَٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ ٱلْفَجْرِ

এই শান্তির ধারা ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
Peace!…This until the rise of morn!

আলোচ্য সূরার প্রথম আয়াতের ‘কদর’ শব্দ থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে সূরাতুল কদর।

সূরাতুল কদরের শানে নূযুলঃ-
আল্লামা ইবনে কাসীর (র) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম (স) সাহাবীদের নিকট বনী ইসরাইলের এক দরবেশের কাহিনী বর্ণনা করেন। সে দরবেশ একটানা ৮৪ বছর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছিলেন। এ কাহিনী শুনে সাহাবীগণ বিস্মিত হলেন এবং নিজেদের ক্ষুদ্রকালীন আমলের ব্যাপারে অনুশোচনা করলেন। তারা বললেন, পূর্বেকার লোকদের হায়াত বেশি ছিল, কিন্তু আমাদের হায়াত কম। এজন্য আমাদের ইবাদতও কম হবে। তখন আল্লাহ তায়ালা অত্র সূরা নাযিল করেন। এতে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য লাইলাতুল কদরের ন্যায় বিশেষ রাতের ব্যবস্থা করেছি, তাই অনুশোচনার কোন কারন থাকতে পারে না।

এ রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

شَهْرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلْقُرْءَانُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٍ مِّنَ ٱلْهُدَىٰ وَٱلْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا۟ ٱلْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا۟ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।
Ramadhan is the (month) in which was sent down the Qur´an, as a guide to mankind, also clear (Signs) for guidance and judgment (Between right and wrong). So every one of you who is present (at his home) during that month should spend it in fasting, but if any one is ill, or on a journey, the prescribed period (Should be made up) by days later. Allah intends every facility for you; He does not want to put to difficulties. (He wants you) to complete the prescribed period, and to glorify Him in that He has guided you; and perchance ye shall be grateful.

লাইলাতুল কদরের রাত:-

লাইলাতুল কদর নির্ধারণে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান। যথা-

জমহুর মুফাসসিরীনের মতে, এ রাত রমদ্বান মাসের মধ্যেই অতিবাহিত হয়।
তবে রমদ্বান মাসের কোন রাত সে রাত নির্ণয়ে মতানৈক্য রয়েছে। যথা-

১. ইমাম আবু হানিফা (র) জমহুর ওলামায়ে কেরামের মতে, রমদ্বানের ২৭ তারিখের রাতটিই লাইলাতুল কদর হওয়ার বেশি সম্ভাবনা।
দলিল:-
তিনি দলিল হিসেবে বলেন-

আর সুরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার এসেছে। তাতে নয়টি হরফ রয়েছে। ৯ কে ৩ দিয়ে গুণ করলে ২৭ হয়। সুতরাং লাইলাতুল কদর ২৭ তম রাতেই হবে।
২. কেউ কেউ বলেছেন, ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ এ পাঁচ রাতের কোন এক রাত।

রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,
তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদরকে তালাশ করো। -(মুসলিম)
সে হিসেবে এ রাতগুলো হলো- ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯

২০২০
حَدَّثَنِي مُحَمَّدٌ، أَخْبَرَنَا عَبْدَةُ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُجَاوِرُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، وَيَقُولُ ‏ “‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏”‏‏.‏

‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমদ্বানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেনঃ তোমরা রমদ্বানের শেষ দশকে [৩] লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।- (বুখারী শরীফ)

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা ২৭ রমদ্বানের রাতে অনুসন্ধান করে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

হাদিসের নির্ভারযোগ্যতার মাপকাঠীতে বেশি সম্ভাবনাময় লাইলাতুল কদর ২৭ রমদ্বান। অর্থাৎ ২৬ তারিক দিবাগত রাত তথা সন্ধ্যায় শুরু হবে এ মর্যাদার রাত। সেই মাহিন্দ্রক্ষণ শুরু হবে সন্ধ্যায়। মর্যাদার এ রাত পেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করবেন? কী চাইবেন? এ সম্পর্কে হাদিসের একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে-

হজরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ (স) কে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি যদি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?

রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, তুমি বলবে-

اَللهم إنَّكَ عَفُوٌ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنّي

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ (স) এ রাতটি পাওয়ার জন্য রমদ্বানের শেষ দশকে আজীবন ইতেকাফ করেছেন। উম্মতে মুসলিমার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছেন-

★রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমদ্বানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাজিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তাঁর সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম)

২০১৪
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَفِظْنَاهُ وَإِنَّمَا حَفِظَ مِنَ الزُّهْرِيِّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏‏.‏ تَابَعَهُ سُلَيْمَانُ بْنُ كَثِيرٍ عَنِ الزُّهْرِيِّ‏.‏

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রমদ্বানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল ক্বদ্‌রে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। সুলায়মান ইব্‌নু কাসীর (রহঃ) যুহরী (রহঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। – (বুখারী শরীফ)

লাইলাতুল কদরের আমল:-

সুতরাং লাইলাতুল কদর পেলে এ আমল ও দোয়া রাত অতিবাহিত করা জরুরি। তাহলো-

১. নফল নামাজ পড়া।
২. তাহিয়্যাতুল ওযু
৩. দুখুলুল মাসজিদ
৪. কুরআন তিলাওয়াত করা।
৫. তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া
৬. সালাতুত তাসবিহ পড়া।
৭. তাওবার নামাজ পড়া।
৮. সালাতুল হাজাত পড়া।
৯. দরূদ শরিফ পড়া।
১০.তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া।
১১. জিকির-আজকার করা।
১২. পরিবার পরিজন, বাবা-মা ও মৃতদের জন্য দোয়া করা।
১৩. কবর জিয়ারত করা
১৪. তাসবীহ- তাহলীল। ইত্যাদি

লেখকঃ-
মুফতি আল আমিন ইসলাম সরকার যুক্তিবাদী,হবিগঞ্জী
কামিল এম.এ হাদিস, এম.এ ফিকহ, এম.এ তাফসির, দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা।
মোবাইলঃ ০১৭১৪-৩৫২১৬৬

সর্বশেষ সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সব ধরনের সংবাদ পেতে ক্লিক করুন।
দৈনিক হাওড় বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD
jphostbd-2281