ইতিকাফকারীর করণীয় ও বর্জনীয়
- মুফতি আল আমিন ইসলাম সরকার যুক্তিবাদী
---------------------------------------
★ইতিকাফের আভিধানিক অর্থ:-
১. অবস্থান করা
২. আটকে রাখা
৩. নিজেকে বন্দী রাখা
৪. নির্দিষ্ট সময় বা গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা।
৫. মসজিদে অবস্থান করা
৬. সাধারণ অবস্থান করা।
★ইতিকাফের পারিভাষিক সংজ্ঞাঃ-
১. ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে রমদ্বানের শেষ দশদিন বিশেষ ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে।
২. জমহুর ওলামায়ে কেরাম বলেন-
মসজিদে কোন বিশেষ ব্যক্তির বিশেষ ধরনের অবস্থানকে ইতিকাফ বলে।
৩. ইমাম কুদূরী (রহ.) বলেন-
ইতিকাফের নিয়তে রোযা সহকারে মসজিদে অবস্থান করার নাম ইতেকাফ।
৪. আল্লামা জুরজানী (রহ.)-এর ভাষায়-
নিয়তসহ জামে মসজিদে রোযাদার ব্যক্তির অবস্থানকে ইতিকাফ বলে।
৫. ইতিকাফের সংজ্ঞা হল, ইতেকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। (নিহায়া)
★ইতিকাফের প্রকারভেদ :-
ইতিকাফ তিন প্রকারঃ- ১. ওয়াজিব ২. সুন্নাতে মুয়াক্বাদা ৩. মুস্তাহাব।
১.ওয়াজিব ইতিকাফ :- সরাসরি ইতিকাফের মানত করা অথবা কোন কাজ হওয়া না হওয়ার শর্ত সাপেক্ষে মানত করা।
২. সুন্নাতে মুয়াক্বাদা :- সুন্নাতে মুয়াক্বাদা হল, রমদ্বানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা।
৩. মুস্তাহাব :- ওয়াজিব ও সুন্নাতে মুয়াক্বাদা ছাড়া অবশিষ্ট সব ইতিকাফ।
★ইতিকাফের শর্তাবলি :-
প্রথম শর্ত হল, ইতিকাফের নিয়ত করা। তাই কেউ বিনা নিয়তে ইতেকাফ করলে ইজমা অনুসারে তা জায়েয হবে না। (মি'রাজুদ দিরায়া)
দ্বিতীয় শর্ত হল, জামায়াতের সাথে যে মসজিদে আযান ও ইকামত দেওয়া হয়, সহীহ ভাষ্য মতে তাতে ইতিকাফ করা সহীহ আছে। (খুলাসা)
সর্বোত্তম ইতেকাফ হল, মাসজিদুল হারামে ইতিকাফ করা। তারপর মসজিদে নববীতে, তারপর বায়তুল মাকদিসে, তারপর জামে মসজিদে, তারপর সে মসজিদে বেশী পরিমাণে মুসল্লির সমাগম হয়, সেরুপ মসজিদে। (তাবয়ীন)
মহিলাগণ ঘরে ইতিকাফ করবে। যখন মহিলা তার ঘরের মসজিদে ইতিকাফের নিয়ত করবে, তখন ঐ স্থানটি তার জন্য পুরুষ লোকদের জামায়াতে নামাজ পড়ার সমমানের হয়ে যাবে। এজন্য মহিলাগণ মানবীয় প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে পারবে না।
(শারহুল মাবসূত)
ঘরে মসজিদ না থাকলে একটি স্থানকে মসজিদের জন্য নির্ধারিত করে নেবে এবং সেখানে ইতিকাফ করবে। (যাহিদী)
আর এক শর্ত হল, ইতিকাফের সাথে রোযা রাখা।
★ইতিকাফের আদবসমূহ:-
পূণ্য বা সওয়াবের কথা ছাড়া কথাবার্তা না বলা, রমদ্বানের শেষ দশ দিনকে ইতেকাফের জন্য অপরিহার্য করা, উত্তম মসজিদে যেমন, মাসজিদুল হারাম ও জামে মসজিদকে ইতিকাফের জন্য বেছে নেওয়া।
(আস সিরাজুল ওয়াহহাজ) কুরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা, হাদিস পড়া, ইলম হাসিল করা, জ্ঞান অর্জন করা, সীরাতুন নবীর আলোচনা করা, পূণময়ী লোকদের জীবনালোচনা করা ও দ্বীনের কথা বলা। ( ফাতহুল কাদির) যে সকল কথাবার্তায় গুনাহ নেই, সেগুলো বলতে কোন দোষ নেই। (শরহুত তাহাবী)
★ইতিকাফ ভঙ্গ হওয়ার কারন :-
১. মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়া। বিনা কারনে ইতিকাফকারী রাত বা দিনে মসজিদ থেকে বের হবে না। বিনা ওযরে অল্প সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)- এর মতানুসারে ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। ইচ্ছাপূর্বক বের হোক কিংবা ভুলক্রমে বের হোক। (ফাতাওয়ায়ে কাযীখান) ইতিকাফকারী মহিলা ঘরের মসজিদ থেকে থাকার ঘরে যেতে পারবে না। (মুহিতঃ সুরাখ্সী)
২. মসজিদ সংলগ্ন ইতিকাফকারীর কোন বন্ধু বাড়ী থাকলে তা পেশাব, পায়খানার প্রয়োজন মিটানোর জন্য লাযিম করবে না। ইতিকাফকারীর দূরে ও পাশে দু'টি বাড়ি থাকলে কেউ কেউ বলেন, ইতিকাফকারীর দূরের বাড়ীতে পেশাব-পায়খানার জন্য গমন করা জায়েয নয়। দূরবর্তী বাড়িতে চলে গেলে ইতিকাফ বাতিল হয়ে যাবে।
(আস সিরাজুল ওয়াহহাজ) মানবীয় প্রয়োজনে ইতিফকারী মসজিদ থেকে বের হলে নম্র ভাবে হাটবে (নিহায়া,ইনায়া)। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমানো ইতেকাফ স্থলে সম্পাদন করবে। কারন এসব কারন মসজিদের অভ্যন্তরে করা সম্ভব। সুতরাং এগুলোর জন্য মসজিদ থেকে বের হবার প্রয়োজন নেই। (হিদায়া)
৩. পেশাব পায়খানার জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর পাওনাদার ইতিকাফকারীর কিছু সময় আটকে রাখলে ইমাম আবু হানিফার মতানুসারে ইতেকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)- এর মতানুসারে ফাসিদ হবে না। ইমাম সুরাখ্সী (রহ.) বলেন, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)- এর কথা সাধারণ মুসলমানদের জন্য সহজতর। (খুলাসা) রোগির সেবাযত্নের জন্য মসজিদ থেকে বের হবে না। (আল বাহরুর রায়িক)
জানাযার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। অনুরুপ জানাযার নামাজের জন্য বের হলে যদিও জানাযার নামাজ তার জন্য নির্দিষ্ট থাকে অথবা ডুবে যাওয়া লোক কিংবা পুড়ে যাওয়া লোককে উদ্ধারের জন্য বা জিহাদের জন্য বের হয়, আর ঘটনাস্থলে জনসাধারণ উপস্থিত থাকে। সাক্ষ্যদানের জন্য বের হলেও অনুরুপ ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। অসুস্থতার কারনে কিছু সময়ের জন্য বের হলে অনুরুপ ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। ইতিকাফের মানত করার সময় অথবা ইতিকাফ লাযিম করার সময় রোগির সেবাযত্ন, জানাযার নামাজ, ইলমের মজলিসে উপস্থিতির শর্ত করলে ইতিফকারীর জন্য জন্য এসব কাজের জন্য বের হওয়া জায়েয হবে। (তাতারখানিয়া)
মিনারের ওপরে চড়লে মতানৈক্যের ভিত্তিতে ইতিকাফ ফাসিদ হবে না। যদিও মিনারের দরজা মসজিদের বাহিরে থাকে ( বাদাই' মুয়াজ্জিন ও গাইরে মুয়াজ্জিন এ হুকুমের ক্ষেত্রে সমান। এট সহিহ মত। খুলাসা, (ফাতাওয়ায়ে কাযীখান)
৪. মাথা ধৌত করার উদ্যেশ্যে নিজ পরিবারের কারও দিকে মাথা বের করে দেয়ায় কোন দোষ নেই। + (তাতারখানিয়া) এসব হুকুম হল ওয়াজিব ইতিকাফ সমন্ধে। নফল ইতিকাফে যাহিরী রিওয়ায়েত অনুসারে কারণে, অকারণে বের হওয়াতে কোন বাঁধা নেই।
তুহফায়ে উল্লেখ আছে, রোগির সেবাযত্নে এবং জানাযায় উপস্থিত হতে কোন বাধা নেই। (শারহুন নিকায়া, শায়খ আবুল মাকারিম কৃত)।
ইতেকাফ ভঙ্গ হওয়ার কারনসমূহের মাঝে আরও একটি কারণ হল সহবাস করা ও সহবাসের প্রতি যা আকৃষ্ট করে তা। এই জন্যই ইতিকাফকারীর জন্য সহবাস ও সহবাসের অনুষঙ্গিক কার্যাবলি হারাম।
যেমন, মুবাশারা, চুম্বন করা, স্পর্শ করা, কোলাকুলি করা, যোনিদ্বার ছাড়া অন্যত্র সহবাস করা। এসব কাজ রাত দিন উভয় সময় করলে এই হুকুম হবে। সহবাস হোক বা না হোক। সহবাস ছাড়া অন্যান্য অনুষঙ্গিক বিষয়ে বীর্য নির্গত হলে ইতিকাফ ফাসিদ হবে, অন্যথায় ফাসিদ হবে না। (বাদাই)
৫. সহবাসের ধ্যান করার অথবা দৃষ্টিপাত করায় বীর্য নির্গত হলে ইতিকাফ ফাসিদ হবে না। (তাবয়ীন) স্বপ্নদোষ হলেও অনুরুপ ফাসিদ হবে না। ফাতহুল (কাদির) স্বপ্নদোষ হওয়ার পর মসজিদের ময়লা করা ব্যতিত মসজিদেই গোসল করবে। এতে কোন বাধা নেই। অন্যথায় মসজিদ থেকে বের হয়ে গোসল করবে এবং মসজিদে ফিরে আসবে। মসজিদের ভেতর কোন পাত্রে উযূ করা সম্ভব হলে উক্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষ হবে। (বাদাই' ও ফাতাওয়ায়ে কাযীখান)
ইতিকাফ ভঙ্গ হওয়ার কারনসমূহের মধ্যে বহুশ হওয়া ও পাগল হওয়া। শুধু পাগল হওয়ার ও বেহুশ হবার মতানৈক্যের ভিত্তিতে ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না যতক্ষণ না লাগাতার তা বন্ধ হবে। যদি কতক দিন বেহুশ থাকে অথবা কিছুটা পাগলামি ভাব আসে, তবে ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে।
এরুপ ব্যক্তির ওপর পরবর্তীতে ভাল হবার পর কাযা ওয়াজিব। পাগলামি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে কতক বছর স্থায়ী থাকলে সুস্থ হবার পর তার ওপর কাযা করা ওয়াজিব। (বাদাই) জ্ঞানহীন হয়ে কতেক বছর থাকার পর সুস্থ হয়ে উঠলে তার ওপর কাযা আদায় করা ওয়াজিব হবে। (ফাতাওয়ায়ে কাযীখান)
★ইতিকাফের নিষিদ্ধ কার্যাবলি:-
১. চুপচাপ থাকা। যে ব্যক্তি একে ইবাদত মনে করবে তার জন্য হল তা মাকরুহ। (তাবয়ীন) আর ব্যক্তি চুপচাপ থাকাকে সওয়াবের কাজ মনে না করে তার জন্য তা মাকরুহ নয়। (আল বাহরুর রায়িক)
গালিগালাজ করলে, ঝগড়া ফাসাদে লিপ্ত হলে ইতিকাফ ফাসিদ হয় না। (খুলাসা)
২. ইতিকাফকারীর জন্য খাদ্যদ্রব্য ও নিজ প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বেচাকেনা করায় কোন দোষ নেই। মসজিদকে বেচাকেনার কেন্দ্র বানানো মাকরুহ (ফাতাওয়ায়ে কাযীখান, যখীরা)। এটাই সহীহ অভিমত।
৩. ওয়াজিব ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে গেলে এর কাযা আদায় করা ওয়াজিব। নির্দিষ্ট কোন মাসের ইতিকাফের মাঝে একদিন রোযা ভেঙ্গে ফেললে ঐ একদিনের কাযা করতে হবে। অনির্দিষ্ট কোন মাসের ইতিকাফ হলে আগামী দিনে তা আদায় করতে হবে। নিজ কাজের দরুন বিনা ওযরে ইতিকাফ ফাসিদ হোক, যেমন মসজিদ থেকে বের হওয়া, সহবাস করা এবং দিনের বেলা পানাহার করা বা নিজ কাজের দরুন ওযরের কারনে ইতিকাফ ফাসিদ হোক, যেমন অসুস্থ হওয়া বাধ্য হয়ে মসজিদ থেকে বের হবার অথবা নিজ ক্রিয়াকলাপ ছাড়া অন্য কোন ওযরের কারণে ইতিকাফ ফাসিদ হোক, যেমন হায়েয আসা, পাগল হওয়া ও দীর্ঘ দিন অজ্ঞান বা বেহুশ থাকা ইত্যাদি অবস্থায় হুকুমের মধ্যে কোন পার্থক্য হবে না। (ফাতহুল কাদীর)
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাউছার উদ্দিন সুমন || নির্বাহী সম্পাদক: আনিছুর রহমান পলাশ || বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: 01647-834303, বার্তা বাণিজ্যিক কার্যলয়:- জয়নগর বাজার,সুনামগঞ্জ,সিলেট। ই-মেইল:- Haworbartaofficials@gmail.com
দৈনিক হাওড় বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © 2026
