

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি: জাতীয়করণের আট বছর পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি মোহাম্মদ চৌধুরী একাডেমি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। একের পর এক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে প্রায় শতবর্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে এমসি একাডেমি নামে পরিচিত। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ হয়। তবে জাতীয়করণের সময় তৎকালীন অধ্যক্ষ মনসুর আহমদ চৌধুরী ও সহকারী প্রধান শিক্ষক আফতাব উদ্দিনের বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দুটি পদ স্থায়ী কাঠামোয় বহাল থাকেনি বলে জানা গেছে।
এরপর নতুন করে অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃজন করে নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরেও সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমেই চলছে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, জাতীয়করণের পর জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সুজিত কুমার তালুকদার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। পরে তিনি অবসরে গেলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অসীম কুমার শর্মা দায়িত্ব পান। এরপর বাংলার শিক্ষক ভানুষ কান্তি ভট্টাচার্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বর্তমানে তিনিই প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে পরবর্তী জ্যেষ্ঠতার তালিকায় গণিত বিভাগের শিক্ষক সোনাধন চন্দ্র দাস এবং হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আলাল মিয়ার নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, স্থায়ী অধ্যক্ষের পদ সৃজন ও নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
জাতীয়করণের পরপরই স্থায়ী অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ২০২৫ সালে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেন বলে জানা গেছে। পরে সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর ডিও লেটার নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদ দুটি সৃজনের জন্য আবেদন করা হয়।
তবে জাতীয়করণের পর এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর কেন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলো—এ নিয়ে শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ভানুষ কান্তি ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জাতীয়করণের সময় প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিরা আত্মীকরণের আওতায় না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে পদগুলো বহাল থাকে না। পরে পদ সৃজনের বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগোয়।
তার ভাষ্য, ‘আমলাতান্ত্রিক সিস্টেমের কারণে বছরের পর বছর অনেক বিষয় আটকে থাকে।’
তিনি জানান, চলতি বছর সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর ডিও লেটারের মাধ্যমে অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃজনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।
জাতীয়করণের পর প্রতিষ্ঠানটির আগের পরিচালনা কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে একাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচন নিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করে নির্দিষ্ট কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগটি অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, ‘স্বজনপ্রীতি নয়, সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়েই একাডেমিক কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।’
এদিকে জাতীয়করণের পর থেকেই শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকদের পারস্পরিক অবস্থান নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ভৌতবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক উজ্জল কুমারকে ঘিরেও নানা অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে তেল চুরির অভিযোগ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে পৃথকভাবে যাচাই প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো দ্রুত স্থায়ী করার দাবি জানিয়েছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
গোলাপগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি ও এমসি একাডেমির সাবেক ছাত্র মশিকুর রহমান মহি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ড ধরে রাখতে হলে অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন।’
এমসি একাডেমির ছাত্রসংসদের সাবেক এজিএস ও জিএস আল নবী চৌধুরী শিপন বলেন, ‘আমাদের প্রাণের এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ। পদ সৃজনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তত ডেপুটেশনের মাধ্যমে একজন অধ্যক্ষ পদায়ন করা প্রয়োজন।’
কানাডাপ্রবাসী সাবেক শিক্ষার্থী ও জাতীয় দৈনিক মানবকণ্ঠের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দুলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো এভাবে দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকা কাম্য নয়।’
তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও এমসি একাডেমির সাবেক শিক্ষার্থী ড. শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘স্থায়ী দুটি পদ সৃষ্টি না হওয়ায় ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে। তবে দেরিতে হলেও পদ সৃজনের জন্য আবেদন করা হয়েছে, এটি আশাব্যঞ্জক।’
তিনি বলেন, পদ সৃজনের প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগলে আপাতত ডেপুটেশনের মাধ্যমে একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষককে অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করা যেতে পারে।
প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এমসি একাডেমি জাতীয়করণের আট বছর পরও স্থায়ী অধ্যক্ষ ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পায়নি। একের পর এক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন প্রশ্ন—স্থায়ী পদ দুটি কবে সৃষ্টি হবে, কবে নিয়োগ হবে এবং কবে শেষ হবে দীর্ঘদিনের ভারপ্রাপ্ত নির্ভরতা?


সম্পাদক ও প্রকাশক : কাউছার উদ্দিন সুমন
নির্বাহী সম্পাদক : আনিছুর রহমান পলাশ
বার্তা সম্পাদক: শহিদুল ইসলাম রেদুয়ান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : এডভোকেট সুজন দেওয়ান
নিউজ রুম ও বিজ্ঞাপন: 01647-834303 বার্তা বাণিজ্যিক কার্যলয়:- শান্তিগঞ্জ বাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট। ই-মেইল:- Haworbartaofficials@gmail.com

